Header Ads Widget

একজন নোবেল বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের গল্প।

 

muhammad younus History

মুহাম্মদ ইউনূস যে কারনে বিখ্যাত ছিলেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি "দরিদ্রের জন্য ব্যাংকার" নামে পরিচিত, ক্ষুদ্রঋণের ধারণার পথিকৃৎ। এই পদ্ধতি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ছোট ব্যবসায়িক উদ্যোগের জন্য ঋণ প্রদান করে। ১৯৭৬ সালে, ড. ইউনূস এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক প্রথমবারের মতো ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু করেন, যখন তিনি বাঁশের মল তৈরি করার জন্য একদল দরিদ্র মহিলাকে মাত্র ২৭ ডলার ঋণ দেন। এটি ছিল দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য মাইক্রোক্রেডিট পদ্ধতির প্রথম বাস্তবায়ন, যা পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে অনুকরণ করা হয়।

banner 

প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেন, তার গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার এবং মাইক্রোক্রেডিটের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণে অবদানের জন্য। ১৯৮৩ সালে তিনি বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল দরিদ্র মানুষকে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা এবং তাদের আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনে সহায়তা করা। তার প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ, গ্রামীণ ব্যাংক মডেলটি সারা বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে অনুসরণ করা হচ্ছে।

প্রফেসর ইউনূস চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পিএইচডি অর্জন করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরামর্শক পরিষদের সদস্য ছিলেন।

তার অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, যেমন মোহাম্মদ শাবদিন পুরস্কার, CARE হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাওয়ার্ড, বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার, স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, এবং সিউল শান্তি পুরস্কার। চলুন তার জীবন দেখি...

প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস: জীবন বৃত্তান্ত

প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস (জন্ম: ২৮ জুন, ১৯৪০) একজন বিশ্বখ্যাত বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি মাইক্রোক্রেডিট এবং মাইক্রোফাইন্যান্সের ধারণার প্রবর্তক, যা বিশ্বের দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখেছে। তার এই অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন।

শৈশব ও শিক্ষা

মুহাম্মদ ইউনূস চট্টগ্রাম জেলার হাথাজারী উপজেলার একটি ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন একজন স্বর্ণকার এবং মা পরিবারের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন। ইউনূসের শৈশব জীবন কেটেছে চট্টগ্রামে। তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৫৭ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধাতালিকায় স্থান লাভ করেন। পরে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি ফুলব্রাইট বৃত্তি পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি পিএইচডি লাভ করেন এবং ১৯৭০ সালে তিনি মিডল টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন।

কর্মজীবন

বাংলাদেশে ফিরে আসার পর, মুহাম্মদ ইউনূস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ তার চিন্তাধারাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। তিনি অনুভব করেন যে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা দরিদ্র মানুষকে ঋণ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই উপলব্ধির ভিত্তিতে তিনি দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ শুরু করেন।

১৯৭৬ সালে, তিনি নিজ উদ্যোগে একটি পরীক্ষা চালান—চট্টগ্রামের জোবরা গ্রামে কিছু দরিদ্র বাস্কেট উইভারদের ঋণ প্রদান করেন। এটাই ছিল মাইক্রোক্রেডিট ধারণার প্রথম প্রয়োগ। তার এই প্রাথমিক পরীক্ষাটি অত্যন্ত সফল হয় এবং এই ধারণার ভিত্তিতে তিনি ১৯৮৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। এই ব্যাংকের মূল লক্ষ্য ছিল দরিদ্র মানুষ, বিশেষত নারী, যারা প্রচলিত ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরে ছিল, তাদের ঋণ প্রদান করা।

গ্রামীণ ব্যাংক ও মাইক্রোক্রেডিট আন্দোলন

গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে মুহাম্মদ ইউনূস যে মাইক্রোক্রেডিট পদ্ধতির প্রবর্তন করেন, তা সারা বিশ্বে দারিদ্র্য বিমোচনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ব্যাংক ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষকে তাদের জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ করে দেয়। ২০০৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, গ্রামীণ ব্যাংক ৭ মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে ঋণ প্রদান করেছে, যাদের বেশিরভাগই নারী।

গ্রামীণ ব্যাংক মডেলটি সারা বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে অনুসরণ করা হচ্ছে এবং এটি মাইক্রোফাইন্যান্স আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই মডেলের সাফল্যের ফলে অনেক দেশেই ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণের কাজ শুরু হয়েছে।

নোবেল পুরস্কার ও অন্যান্য সম্মাননা

প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ও তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। দারিদ্র্য বিমোচনে তার এই অসামান্য অবদান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পায়। নোবেল পুরস্কার ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সম্মানজনক পুরস্কার লাভ করেছেন, যেমন:

  • বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার (১৯৯৪)
  • সিউল শান্তি পুরস্কার (২০০৬)
  • যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের স্বাধীনতা পদক (২০০৯)
  • কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল (২০১০)

সামাজিক ব্যবসা ধারণা

মুহাম্মদ ইউনূস শুধুমাত্র মাইক্রোক্রেডিটের ধারণাতেই থেমে থাকেননি, তিনি সামাজিক ব্যবসা বা Social Business ধারণার প্রবর্তন করেন। সামাজিক ব্যবসার মূল লক্ষ্য হচ্ছে মুনাফার উদ্দেশ্যে নয়, বরং সামাজিক সমস্যার সমাধান করা। এই ব্যবসার মডেলটি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ ধারণার ওপর ভিত্তি করে কাজ করছে।

ব্যক্তি জীবন

মুহাম্মদ ইউনূস ব্যক্তিগত জীবনে এক কন্যাসন্তানের জনক। তার কন্যা মোনীকা ইউনূস একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গায়িকা। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বক্তৃতা দেন এবং তার প্রতিষ্ঠানের কাজ সম্পর্কে আলোচনা করেন।

গ্রন্থাবলি

প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন, যার মধ্যে অন্যতম হল:

  • "ব্যাংকার টু দ্য পুওর" (১৯৯৮): এই বইতে তিনি তার জীবনের গল্প এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরেছেন।
  • "Creating a World Without Poverty" (২০০৭): এই বইয়ে তিনি মাইক্রোক্রেডিট ও সামাজিক ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেছেন।
  • "A World of Three Zeros" (২০১৭): এখানে তিনি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য তিনটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, এবং শূন্য কার্বন নিঃসরণ।

উপসংহার

প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস একাধারে একজন অর্থনীতিবিদ, সমাজসংস্কারক এবং বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য বিমোচনের একজন পথিকৃৎ। তার কাজ এবং জীবন দর্শন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম এবং তার উদ্ভাবনী ধারণা মাইক্রোক্রেডিট আজ সারা বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ